দেখতে দেখতে চলে এলাম ডিজিটাল প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট এর তিন পর্বের সিরিজের শেষ পর্বে। প্রথম পর্বে জেনেছিলাম সোশ্যাল রিওয়ার্ড এর ভূমিকা, দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করেছিলাম ইউজার ড্রাইভেন কনটেন্ট ও আনপ্রেডিক্টেবিলিটি বা সাসপেন্স এর গুরুত্ব। এবার যাওয়া যা আজকের পর্বের মূল আলোচনায়।
একবার একটি ফ্রেঞ্চ গবেষণার অংশ হিসেবে একটি এক্সপেরিমেন্ট চালানো হয়। একটি বাসে একজন আগন্তুককে পাঠানো হয় বাস ফেয়ার কালেক্ট করার জন্য কিছু স্পেশাল শব্দ ব্যবহার করে। তারা দেখতে পেলেন সাধারণের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ মানুষ টাকা দিয়েছে। এর মাধ্যমে রিসার্চাররা একটি সাধারণ কিন্তু বেশ কার্যকর পন্থা বের করেছেন যা পরবর্তীতে চ্যারিটি ফান্ড কালেকশন ও সার্ভে করার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করে দেখেন প্রায় একই ধরণের কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
কি ছিল সেই টেকনিক? তারা শুধু কিছু শব্দ ব্যবহার করেছিল “But you are free to accept or refuse”। রিসার্চাররা এই টেকনিককে নাম দিয়েছিলেন “But you are free” টেকনিক। এটির ব্যাখ্যায় যা বুঝানো হল তা সহজভাবে বললে যা দাঁড়ায় আমরা চাই কোন কিছু করার বা না করার সিদ্ধান্ত নেয়ার সামর্থ্যটা আমাদের নিজেদের থাক, অন্য কেউ যেন ফোর্স না করে।
প্রোডাক্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিন্তু এই ব্যপারটি সত্য। কয়েকবছর আগেও কিছু ব্লগ ওয়েবসাইট চোখে পড়ত যেগুলোতে প্রবেশ করতে গেলেই একটা পপআপ ফর্ম আসত যেখানে ইমেইল দিয়ে সাবস্ক্রাইভ না করলে পপআপটি ক্লোজ করা যেত না। বলা যায় একপ্রকার জোর করে ইমেইল আইডি নেয়া। তবে মজার ব্যাপার হল ৫০% এর বেশি ভিজিটরই ইমেইল না দিয়েই সাইট লিভ করে।
ঠিক এই রকম ব্যাপার ঘটে কোন একটি সার্ভিসের ফ্রি ট্রায়ালের ক্ষেত্রে। আমার নিজেরও এমন অনেকবার হয়েছে কোন একটি সার্ভিসের ১ মাসের ফ্রি ট্রায়ালের জন্য বেসিক ডাটা দিয়ে সাইনআপ এর লাস্ট স্টেপে গিয়ে দেখি মাস্টার বা ক্রেডিট কার্ড এর তথ্য দিতে হবে। তখন বিরক্ত হয়ে সাইনআপই কমপ্লিট করিনি।
অবশ্য এখন অনেকে এই ব্যপারটাকে মাথায় রেখে এটাকে পজিটিভ মার্কেটিং হিসেবে ব্যবহার করে এভাবে লিখে Free Trial (No credit card information required)। এসব কেইসগুলো বলে দেয় ইউজারদেরকে এমন কিছু করতে ফোর্স করা উচিত নয় যার কারণে ঐ প্রোডাক্ট বা সার্ভিস আর ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।
এবার আসি অন্য আরেকটি ভিন্ন বিষয়ে। আপনি যখন ইমেইলে লগিন করেন তখন সব নতুন ইমেইলগুলো না পড়ে অথবা অন্তত ক্লিক না করে লগআউট করেন না। কারণ যতক্ষণ আনরিড ইমেইল এর সংখ্যা শূন্য না হয় আপনার কেন জানি মনে হয় কাজটি সম্পূর্ণ হয়নি। ঠিক একি জিনিস ঘটে ফেসবুকের নোটিফিকেশন কিংবা ম্যাসেন্জার এর আনসিন ম্যাসেজগুলোর ক্ষেত্রে।
এই ব্যাপারটিকে বলা হয় গেমিফিকেশন। তার মানে ইউজার এই কাজগুলো সম্পূর্ণ করাকে অনেকটা গেম খেলার মত করে উপভোগ করে। গেমাররা যেমন গেমের প্রতিটি স্টেপ সম্পূর্ণ করে একধরণের আনন্দ অনুভব করে ঠিক ইউজাররাও এই কাজগুলো সম্পূর্ণ করে অনেকটা তেমন ফিল করেন। এভাবেই কোন প্রোডাক্টের গেমিফিকেশন ফিচার এটাকে ইউজারের কাছে উপভোগ্য করে তোলে।
শেষ করব আরেকটি মজার ফিচার নিয়ে আলোচনা করে। যখন কোন নতুন আইডিয়া নিয়ে কোন স্টার্টআপ ফাউন্ডার ইনভেস্টরদের এপ্রোচ করে তখন তাদের একটা কমন প্রশ্ন থাকে ফাউন্ডারের কাছে সেটি হলঃ ”আপনারা যেটা ডেভেলপ করছেন সেটা কি ভিটামিন না কি পেইন কিলার?”
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ হতে বেশিরভাগ ইনভেস্টর এই প্রশ্নের উত্তর পেইন কিলার শুনতে চায় পজিটিভ সিদ্ধান্তের জন্য। কারণ মানুষ পেইন কিলার এর প্রয়োজন যেভাবে অনুভব করে কিন্তু ভিটামিন এর প্রয়োজন তেমনটা করে না।
এখন বলতে পারেন তাহলে ফেসবুক কিভাবে জনপ্রিয় হল। এটা তো পেইন কিলার টাইপ এমন কিছু না যা মানুষকে কোন পেইন থেকে দ্রুত রিলিফ দেয়। বরং এটা তো বলা যায় ভিটামিন টাইপ কিছু একটা যা মানুষকে একধরণের মেন্টাল স্যাটিসফেকশন দেয়। মজার ব্যাপার হল ফেসবুক যখন ব্যবহারকারীরা নতুন নতুন ব্যবহার করে তখন সেটা তাদের জন্য ভিটামিন হিসেবেই থাকে কিন্তু আস্তে আস্তে যখন মানুষ এটাতে অভ্যস্ত হয়, একটা সার্কেল গড়ে উঠে তার কাছে এটা দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়।
তখন একটা সময় পর পর ফেসবুকে ঢুঁ মেরে না আসলে ভাল লাগে না, অনেকক্ষণ ফেসবুকে না গেলে মনে হয় নতুন কি কি যেন ঘটে যাচ্ছে, কার কোন নিউজ যে মিস হয়ে যাচ্ছে। বলা যায় এক প্রকার অস্বস্তি যেটাকে বলা যায় ডিজিটাল চুলকানী। মানুষ এই পেইন বা চুলকানী থেকে রিলিফ পেতে তৎক্ষণাৎ পেইন কিলার হয়ে যাওয়া ফেসবুকে ঘুরে আসে।
এই ব্যাপারটিকে বলা হয় হ্যাভিট ফরমিং ফিচার। তার মানে একটি প্রোডাক্টের ব্যবহার কতটা মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হতে পেরেছে তার উপর এটার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে।
তো এই ছিল আজকের পর্ব। সত্যি বলতে প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট অনেক কিছুর সমন্বয় যা মাত্র তিন পর্বে আলোচনা সম্ভব নয়। আমি শুধু চেষ্টা করেছি যা জেনেছি তা শেয়ার করতে। আপনাদের যাদের এটা নিয়ে বিস্তারিত জানার ইচ্ছে আছে তাদেরকে নিচের বইটি সাজেস্ট করব যেটার উপর ভিত্তি করে আমার পর্বগুলো লিখা।
বইয়ের লিংক: https://www.rokomari.com/book/132492/hooked–how-to-build-habit-forming-products